জাতীয়

বঙ্গভবনে বন্দিদশা ও চক্রান্ত নিয়ে রাষ্ট্রপতির বিস্ফোরক তথ্য

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:১৪:০০

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে আলাপচারিতায় সম্পাদক হায়দার আলী।

টানা দেড় বছরের রুদ্ধশ্বাস বন্দিদশা ও নানামুখী ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে অবশেষে মুখ খুলেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে বঙ্গভবনের ভেতরের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, অসাংবিধানিকভাবে তাঁকে অপসারণের চেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দূরত্বের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন তিনি। একটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এই অজানা অধ্যায়গুলো তুলে ধরেন।

বঙ্গভবন ঘেরাও এবং অপসারণের ষড়যন্ত্র

রাষ্ট্রপতির মতে, গত দেড় বছর ধরে তাকে আড়ালে রেখে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলে। এর চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর, যখন বঙ্গভবন ঘেরাও করা হয়। তিনি জানান, ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা মূলত ভাড়াটিয়া ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন তিন স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ওই বিভীষিকাময় রাতে অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম রাত ১২টায় রাষ্ট্রপতিকে ফোন করে জানান যে, আন্দোলনকারীরা তাদের লোক নয় এবং তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

সাবেক বিচারপতিকে বসানোর ব্যর্থ চেষ্টা

রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ধর্না দিয়েও অপসারণের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার ভিন্ন পথ খোঁজে। রাষ্ট্রপতি জানান, একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদে বসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। সরকারের একজন উপদেষ্টা ওই বিচারপতির সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকও করেন। কিন্তু ওই বিচারপতি দৃঢ়তার সঙ্গে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে জানান, সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির অবস্থান সবার ঊর্ধ্বে, সেখানে অসাংবিধানিকভাবে বসা সম্ভব নয়।

দুঃসময়ে পাশে ছিল বিএনপি ও সশস্ত্র বাহিনী

এই চরম সংকটে রাষ্ট্রপতিকে সাহস জুগিয়েছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এবং রাজনৈতিক দল বিএনপি। রাষ্ট্রপতি বলেন, অসাংবিধানিক উপায়ে তাকে অপসারণের বিরুদ্ধে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কঠোর অবস্থান নেন। তারেক রহমানের আন্তরিকতায় তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। অন্যদিকে তিন বাহিনীর প্রধানরাও তাকে আশ্বস্ত করেন যে, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তার পরাজয় মানে পুরো বাহিনীর পরাজয়, যা তারা হতে দেবেন না।

follow-google-news-provati-barta

ড. ইউনূসের সঙ্গে দূরত্ব ও অসহযোগিতা

রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তার চরম দূরত্বের বিষয়টিও উঠে আসে। রাষ্ট্রপতি জানান, সরকার গঠনের মূল উদ্যোক্তা হওয়া সত্ত্বেও প্রধান উপদেষ্টা তার সঙ্গে কোনো সমন্বয় করেননি। সংবিধানে বিদেশ সফরের পর রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ড. ইউনূস অন্তত ১৪-১৫ বার বিদেশ সফর শেষে একবারও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিসহ ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারির বিষয়েও তাকে অন্ধকারে রাখা হয়।

বিদেশ সফরে বাধা এবং ছবি নামানোর নির্দেশ

রাষ্ট্রপতিকে দেশের মানুষের কাছে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আড়ালে রাখতে অন্তর্বর্তী সরকার সব ধরনের চেষ্টা করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। কসোভো এবং কাতারের মতো দেশগুলো থেকে আসা রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ থেকে তাকে বিরত রাখা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শিষ্টাচারবহির্ভূতভাবে চিঠি ড্রাফট করে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এছাড়া সরকারের এক উপদেষ্টার নির্দেশে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি নামিয়ে ফেলার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে।

প্রেস উইং বাতিল করে কণ্ঠরোধের চেষ্টা

রাষ্ট্রপতির জনসংযোগ বা এক্সপোজার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে তার পুরো প্রেস উইং প্রত্যাহার করে নেয় সরকার। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নবনির্বাচিত কমিটির সঙ্গে সাক্ষাতের একটি খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার জেরে প্রেস সেক্রেটারি থেকে শুরু করে ৩০ বছর ধরে কাজ করা ফটোগ্রাফারদেরও সরিয়ে নেওয়া হয়। জাতীয় দিবসগুলোর রাষ্ট্রীয় ক্রোড়পত্রে রাষ্ট্রপতির ছবি ও বাণী প্রকাশও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর রাষ্ট্রপতির জন্য ছিল এক চরম অগ্নিপরীক্ষা। তবে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় তিনি অবিচল ছিলেন বলেই কোনো ষড়যন্ত্র সফল হতে পারেনি বলে মনে করেন রাষ্ট্রপ্রধান।

আরও খবর:

বিবিধ