৩০ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩২:৩৫
ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির চাঞ্চল্য
প্রভাতী বার্তা প্রতিবেদক | নারায়ণগঞ্জ
একটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হলো সরকারি হাসপাতাল এবং সেখানে কর্মরত চিকিৎসকদের সততা। কিন্তু যখন সেই শাসনব্যবস্থা বা চিকিৎসা সেবা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখন সাধারণ মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে এমন এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে—একটি শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’ পুরো সিস্টেমটিকে কব্জা করে নিয়েছে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে জনস্বার্থকে বলি দিচ্ছে।
বিশেষ করে ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতাল, সিভিল সার্জন অফিস এবং কিছু নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম নিয়ে উঠে আসা তথ্যগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিভিন্ন অনুসন্ধায় এমন সব জালিয়াতির চিত্র বেরিয়ে এসেছে যা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত অপরাধমূলক নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সেই চলছে চিকিৎসা: নেপথ্যে সিভিল সার্জন অফিসের কর্মকর্তারা!
নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র মণ্ডলপাড়া এলাকায় অবস্থিত দুটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো—বঙ্গবন্ধু রোডের ‘ইউনাইটেড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ এবং ‘একতা মেডিকেল সার্ভিসেস’ । সরকারি তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী, দুটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠান দুটি সচল রয়েছে।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো—এই জালিয়াতি সম্ভব হচ্ছে সিভিল সার্জন অফিসের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের মদদেই। অভিযোগ উঠেছে যে, সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের জোর করে এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয় এবং দালালদের মাধ্যমে রোগী সংগ্রহের মতো অন্ধকার কর্মকাণ্ড চলছে। ইউনাইটেড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নেপথ্য মালিক হিসেবে নাম এসেছে নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিসের সিনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা আমিনুল হকের।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি তার সরকারি পদের প্রভাব খাটিয়ে ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে দালালের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন এবং সরকারি রোগীদের ফুসলিয়ে নিজের ক্লিনিকে নিয়ে যান। এর আগে অনিয়মের দায়ে তাকে বদলি করা হলেও রহস্যজনকভাবে তিনি পুনরায় নারায়ণগঞ্জে ফিরে আসেন—যা সাধারণ মানুষের মনে গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, একতা মেডিকেল সার্ভিসেসের মালিকানা রেজাউল করিমের নামে থাকলেও এর নেপথ্যে রয়েছেন তার স্ত্রী লুৎফা খানম, যিনি ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স (সুপারভাইজার) হিসেবে কর্মরত। অভিযোগ উঠেছে, এই দম্পতি নার্সিং পেশার আড়ালে রোগী বাণিজ্যের বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। যদিও জেলার সকল নার্স এই অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত নন, তবে নির্দিষ্ট কিছু অসাধু স্বাস্থ্যকর্মী ও নার্সদের সিন্ডিকেট পুরো ব্যবস্থাটিকে কলুষিত করছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পদমর্যাদা ও যোগ্যতার অবমাননা: সিন্ডিকেটের প্রভাব
হাসপাতালের সাধারণ নার্স ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে সিনিয়র স্টাফ নার্স জেনেভা আফরোজকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। যদিও তাকে সচিবালয় ক্লিনিকে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং সিভিল সার্জনকেও ওএসডি করা হয়েছে, তবুও অভিযোগ উঠেছে যে তিনি এখনও নিয়মিত ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন অফিসে যাতায়াত করছেন এবং প্রশাসনিক কাজে প্রভাব বিস্তার করছেন।
তদন্তে দেখা গেছে, জেলা পাবলিক হেলথ নার্স , ইনচার্জ এবং ম্যাট্রনের পদায়ন বা দায়িত্ব বণ্টনে চরম পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, যোগ্যতা বা সিনিয়রারিটি বিবেচনা না করে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় ধরে একই পদে রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে আমিনুল হক ও জেনেভা আফরোজের সহায়তায় নির্বাচিত কয়েকজন নার্সকে দীর্ঘদিন ইনচার্জ হিসেবে রাখার ফলে সাধারণ রোগীরা মানসম্মত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অফিসিয়াল ডকুমেন্টে ফাঁস হওয়া তথ্য ও তদন্তের সত্যতা
জনপ্রিয় বিভিন্ন নিউজ সাইটের অনুসন্ধায় ইতিমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সত্যতা বেরিয়ে এসেছে। হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ অফিস নথিতে সিনিয়র স্টাফ নার্সদের তালিকা প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে অনিতা রায়, মিনকুন নাহার, ইসরাত জাহান, মাসুমা সিদ্দিকা, রহিমা ভূইয়া, তা হমিনা আক্তারের নাম স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, এই চক্রের মাধ্যমে দায়িত্ব বণ্টনে জালিয়াতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া বদলি হওয়া নার্সদের কাছ থেকে সিভিল সার্জনের নাম ব্যবহার করে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে ছাড়পত্র দেওয়ার মতো আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ ২-৫ বছর ধরে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে ইনচার্জ পদে রেখে ক্ষমতা ভোগ করার ফলে হাসপাতালের সামগ্রিক সেবার মান দ্রুত নিম্নমুখী হচ্ছে বলে সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুয়া বিল-ভাউচার বানিয়ে ডিস্ট্রিক্ট একাউন্ট অফিসার কে কমিশন দিয়ে লাখ লাখ টাকা পাস করে এখন তারা এক এক জন টাকার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। এখানে নূর আলম ( হিসাব রক্ষক) ও আমিনুল হক ( সিনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা ) এর নাম বিশেষভাবে বেরিয়ে এসেছে৷
জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া ও তদন্তের দাবি
নারায়ণগঞ্জের সাধারণ নাগরিক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, পুরো হাসপাতালটি একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। এর ফলে চিকিৎসার গুণগত মান হ্রাস পাচ্ছে এবং দুর্নীতি বাড়ছে। অভিযোগকারীরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা চান যেন জেনেবা আফরোজের প্রভাবশালী বলয় ও পদমর্যাদা, যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ বণ্টন, ইনচার্জ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে কর্মকর্তাদের যোগসূত্র নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত করা হয়।
তদন্তে যদি এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বর্তমানে এই ইস্যুটি জনস্বাস্থ্য ও প্রশাসনের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে ।
এখন দেখার বিষয় ওএসডি হয়ে বিদায় নেয়া সিভিল সার্জনের ব্যর্থতা কতটুকু দূর করতে পারেন নবাগত সিভিল সার্জন ডা. এস. এম. সাখাওয়াত হোসেন!

















