২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫:২২:২৭
ইসিবি চত্বরে নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর | প্রভাতীবার্তা
রাজধানীর দক্ষিণ মানিকদীতে নিউগিনি প্রপার্টিজে সশস্ত্র হামলা, ৫০ রাউন্ড গুলি ও ৩ কোটি টাকার ক্ষতি। সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে তাণ্ডব। সাবেক মেজর জেনারেলসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা।
প্রভাতী বার্তা ডেস্ক, ঢাকা: রাজধানীর ঢাকা সেনানিবাস সংলগ্ন ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদী এলাকায় ‘নিউগিনি প্রপার্টিজ লিমিটেড’ নামক একটি আবাসন প্রকল্পে ভয়াবহ সশস্ত্র হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। গত শনিবার দিবাগত রাতে সংঘটিত এই হামলায় আবাসন প্রকল্পের কার্যালয়ের পাশাপাশি জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওতেও ব্যাপক তাণ্ডব চালানো হয়।
ভয়াবহ সেই রাতের বর্ণনা
মামলার এজাহার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, গত শনিবার দিবাগত রাত ১১টা ২০ মিনিটের দিকে এই হামলার সূচনা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ৫টি পিকআপ ভ্যানে করে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ জন সশস্ত্র দুর্বৃত্ত প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করে। তাদের হাতে ছিল শটগান, পিস্তল, চাপাতি, রামদা এবং লাঠিসোঁটা। আতঙ্ক সৃষ্টি করতে হামলাকারীরা অন্তত ৫০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে।
হামলার সময় সাইট ইঞ্জিনিয়ার পারভেজকে রিভলবারের বাট দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার পায়ে ও পিঠে কোপানো হয়। দুর্বৃত্তরা তার পকেট থেকে নগদ টাকাও ছিনিয়ে নেয়। এছাড়া নিরাপত্তাকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলামকে মারধর করে তার ওয়্যারলেস সেট ও মোবাইল লুট করা হয়।
ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ ও লুটতরাজ
নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক ও মামলার বাদী মো. সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়ার দাবি অনুযায়ী, হামলায় ১ কোটি ৪২ লাখ ৮০ হাজার টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ৪৩ হাজার টাকার মালামাল লুট হয়েছে। দুর্বৃত্তরা অফিসের লকার ভেঙে নির্মাণ সামগ্রী কেনার জন্য রাখা নগদ ২৫ লাখ টাকা, ২৩ টন রড (যার বাজারমূল্য প্রায় ২০ লাখ ৮০ হাজার টাকা) এবং একটি মোটর স্কুটার নিয়ে যায়। এছাড়া অফিসের মূল ফটক, থাই গ্লাস এবং কম্পিউটার সামগ্রী ভাঙচুর করা হয়।
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে তাণ্ডব
একই প্রকল্পে ভাড়া নেওয়া জনপ্রিয় ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ‘ব্রাউনফিশ’-এ ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় হামলাকারীরা। সেখান থেকে টিভি, এসি, দামি ক্যামেরা, লেন্স, এডিটিং পিসি, সার্ভার এবং মাইক্রোফোনসহ মোট ৩৭ ধরনের ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম লুট ও ভাঙচুর করা হয়। ঘটনার পরপরই ফেসবুক লাইভে এসে বিধ্বস্ত স্টুডিওর দৃশ্য দেখিয়ে সালমান মুক্তাদির বলেন, “পুরো অ্যাটাকে আমাদের স্টুডিও ধ্বংস হয়ে গেছে।” তিনি অভিযোগ করেন, ভোরে থানায় গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ তার মামলা নিতে গড়িমসি করেছে।
পুলিশের সাথে গোলাগুলি ও গ্রেপ্তার
খবর পেয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও ৫ রাউন্ড পাল্টা গুলি ছোড়ে। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এই ঘটনায় পুলিশ ও ডিবি যৌথ অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে অন্যতম হলো মামলার ১ নম্বর আসামি ও মূল পরিকল্পনাকারী শাহরিয়ার মাহমুদ এবং ‘মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের’ নেতা শাহ আলম অনিক।
নেপথ্যে জমির বিরোধ ও রাজনৈতিক যোগসূত্র
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, এই সহিংসতার মূল কারণ জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সেখানে প্রায় ৩৫ কাঠার একটি বিতর্কিত জমি রয়েছে। নিউগিনি প্রপার্টিজের দাবি, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী নিজে উপস্থিত থেকে এই হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন। যদিও জেনারেলের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, স্থানীয় কিছু সূত্রের দাবি, বিগত সরকারের আমলে নিউগিনি প্রপার্টিজের মালিকপক্ষ প্রভাব খাটিয়ে জমি দখল করেছিল, যা এখন প্রতিপক্ষ উদ্ধারের চেষ্টা করছে।
সালমান মুক্তাদিরের চাঁদাবাজির ইঙ্গিত প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সালমান মুক্তাদির কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি। তিনি যদি সুনির্দিষ্ট তথ্য দেন, তবে আমরা ব্যবস্থা নেব।” বর্তমানে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অন্যান্য অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এলাকাটিতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

















