অর্থনীতি

তথ্যপ্রযুক্তি ও সার শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে চায় জাপানের মারুবেনি

১১ অক্টোবর ২০২৬, ৪:২৮:২৯

বাংলাদেশে সার, তথ্যপ্রযুক্তি, এআই ডেটা সেন্টার ও জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পসহ একাধিক খাতে বিশাল বিনিয়োগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে জাপানের মারুবেনি করপোরেশন।

প্রভাতী বার্তাকে গুগল পছন্দে যুক্ত করুন!

বাংলাদেশে বিদ্যমান বহুমাত্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিভিন্ন নতুন শিল্প ও উদীয়মান খাতে বৃহৎ বিনিয়োগের প্রবল আগ্রহ ব্যক্ত করেছে জাপানের বিখ্যাত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান মারুবেনি করপোরেশন। বাংলাদেশে এক বৈচিত্র্যময় শিল্প বিপ্লব ও আধুনিক প্রযুক্তিগত রূপান্তরের অংশ হিসেবে সার উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি, এআই ডেটা সেন্টার স্থাপন, অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলিং, পরিবেশবান্ধব জাহাজ পুনর্ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানিনিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

একই দিনে পৃথক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে মারুবেনি করপোরেশনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। জবাবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাপানি বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সুবিধা প্রদানের স্পষ্ট আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ও এআই ডেটা সেন্টার পরিকল্পনা

রবিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মারুবেনি করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসাইউকি ওমোতোর নেতৃত্বাধীন একটি শীর্ষ প্রতিনিধিদল। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা এবং বাংলাদেশে শিল্পায়নের নতুন ক্ষেত্র তৈরি নিয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন সাংবাদিকদের জানান, জাপানি এই আন্তর্জাতিক জায়ান্ট বাংলাদেশে নতুন নতুন বিনিয়োগের বিষয়ে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে। আলোচনার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন। মারুবেনি করপোরেশন আগামী ১২ মাসের মধ্যে বাংলাদেশে একটি উন্নত মানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ডেটা সেন্টার চালুর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সামনে এনেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের সার্বিক ডেটা ব্যবস্থাপনা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং উদীয়মান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সার ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে আধুনিকায়ন

বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত পৃথক এক দ্বিপক্ষীয় সভায়ও প্রতিনিধিদলটি সার্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করে। সেখানে মারুবেনির দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার আলোকেই বাংলাদেশে সার খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।

কোম্পানিটির প্রেসিডেন্ট ও সিইও মাসাইউকি ওমোতো জানান, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো)-এর আধুনিকায়ন এবং কাঁচামাল হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের সর্বোচ্চ ও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে সার উৎপাদনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সার উৎপাদনে নতুন প্রযুক্তি সরবরাহ ও সরাসরি যৌথ বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে মারুবেনি। এতে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে সারের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো এবং টেকসই কৃষি অবকাঠামো গড়ে তোলা আরও সহজ হবে।

তথ্যপ্রযুক্তি, এআই ও আইটি অফশোরিং

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারের নজর কাড়ছে। এ সম্ভাবনার প্রশংসা করে মারুবেনির প্রধান নির্বাহী জানান, যৌথ বিনিয়োগের ভিত্তিতে পরিচালিত প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘বিজেআইটি’-এর মাধ্যমে শত শত মেধাবী বাংলাদেশি সফটওয়্যার প্রকৌশলী ইতিমধ্যেই জাপানসহ বিশ্বজুড়ে নিজেদের দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন।

আগামী দিনে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি কেন্দ্রিক সেবার চাহিদা হু হু করে বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ প্রযুক্তির সেবা সরবরাহের (আইটি অফশোরিং) সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এআই হাব হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে দুই পক্ষ একযোগে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

অটোমোবাইল, পাট এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রযুক্তি

জাপানের বিশ্বখ্যাত অটোমোবাইল কোম্পানি টয়োটার গাড়ি স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের প্রস্তাবনা নিয়েও বৈঠকে ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে অটোমোবাইল খাতের স্থানীয় সংযোজন ও যন্ত্রাংশ তৈরির সুযোগ ত্বরান্বিত হতে পারে।

পাশাপাশি, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্পের বহুমাত্রিক রূপান্তরে জাপানের প্রযুক্তিগত সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তadir। তিনি উল্লেখ করেন, প্রচলিত পাটপণ্যের পরিবর্তে বাংলাদেশ এখন উচ্চ মূল্যের নানামুখী পাটপণ্য তৈরির পথ খুঁজছে। পাট আঁশের সঙ্গে তুলা, ভিসকস বা পলিয়েস্টার মিশিয়ে নতুন ধরনের বয়নপণ্য তৈরি, আধুনিক বীজ গবেষণা এবং গবেষণালব্ধ প্রযুক্তির বাস্তবায়নে জাপান বড় অংশীদার হতে পারে।

এছাড়া চট্টগ্রামের জাহাজ পুনর্ব্যবহার (শিপ রিসাইক্লিং) শিল্পে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ প্রযুক্তির প্রবর্তন এবং দেশজুড়ে গড়ে ওঠা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। জ্বালানিনিরাপত্তার জন্য তুলনামূলক কম জায়গায় স্থাপনযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব ‘ক্ষুদ্র মডিউলার পারমাণবিক চুল্লি’ (এসএমআর) প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সহজ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের নিশ্চয়তা

বৈঠকে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী জাপানি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, “বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ উৎসাহিত করতে সরকার কোম্পানি নিবন্ধন পদ্ধতি ডিজিটালাইজড ও সহজ করা, ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তি দ্রুত করা এবং প্রশাসনিক সব জটিলতা কমানোর ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগকৃত মূলধন ও অর্জিত মুনাফা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর (প্রত্যাবাসন) প্রক্রিয়াটি যেন অবাধ ও বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি সরকার নিশ্চিত করছে। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে প্রস্তাবিত ‘সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ (সিইপিএ) বাস্তবায়িত হলে দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্য নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে দুই পক্ষই আশাবাদ ব্যক্ত করে।

এ বৈঠকে শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খানসহ উভয় দেশের সরকারের এবং মারুবেনি করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রভাতী বার্তার সর্বশেষ খবর পেতে
Google News অনুসরণ করুন
Follow ★

আরও খবর:

বিবিধ