২৫ মার্চ ২০২৬, ১২:০৯:১১
১৯৭১ সালের রক্তঝরা মার্চে সারা দেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও জেগে উঠেছিল মুক্তিকামী মানুষ। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদারদের নারকীয় তাণ্ডবের খবর আসার সাথে সাথেই নারায়ণগঞ্জে শুরু হয় প্রতিরোধ। ছাত্র-জনতার অকুতোভয় লড়াই এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যার ইতিহাস আজও নারাণগঞ্জবাসীর হৃদয়ে ক্ষত হয়ে আছে।
ছাত্রদের অস্ত্র সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণ
২৫ মার্চ সকালেই ঢাকা জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল ছাত্র নারায়ণগঞ্জ কোর্টের মালখানা থেকে ১২১টি রাইফেল ও বিপুল পরিমাণ গুলি সংগ্রহ করেন। মালখানার বাঙালি কর্মকর্তাদের পরোক্ষ সহযোগিতায় এই অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে দেওভোগ নাগবাড়ি মাঠে শুরু হয় সশস্ত্র প্রশিক্ষণ। সাধারণ মানুষও নিজ উদ্যোগে সংগৃহীত বন্দুক ও পিস্তল নিয়ে পাড়া-মহল্লায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
ব্যারিকেড ও প্রতিরোধের দুর্গ
২৬ মার্চ সকাল থেকেই ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ আসার পথে পাগলা, আলীগঞ্জ ও ফতুল্লায় রাস্তায় বড় বড় গাছ কেটে ব্যারিকেড দেওয়া হয়। রেললাইন উপড়ে ফেলা এবং চাষাঢ়া রেল গেটে বগি ফেলে পথ আটকে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি সেনাদের প্রবেশ ঠেকিয়ে দেওয়া।
২৭ মার্চের সেই কালো ভোর ও মাসদাইর গণহত্যা
২৭ মার্চ ভোর রাতে ভারী ট্যাংক ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী নারায়ণগঞ্জের দিকে অগ্রসর হয়। পঞ্চবটীর কাছে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে এক পাকিস্তানি সেনা আহত হলে তারা আরও হিংস্র হয়ে ওঠে। বিকেল ৩টার দিকে মাসদাইর এলাকায় ঢুকে গানপাউডার দিয়ে বাড়িঘরে আগুন দেয় হানাদাররা। সেখানে জামিরুল হক ও তার পরিবারসহ বহু সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য ছিল ‘হানজত আলীর মসজিদ’-এ। প্রাণের ভয়ে মসজিদে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ২০ জন মানুষকে বুট পায়ে টেনে বের করে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা।
শহরের পতন ও দীর্ঘ রক্তপাত
২৮ মার্চ সকাল থেকে দুই দিক দিয়ে সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ট্যাংক ও কামানের গোলায় ক্ষতবিক্ষত হয় চাষাঢ়া, নিতাইগঞ্জ ও প্রেসিডেন্ট রোড এলাকা। এরপর থেকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে চলেছে চরম নৃশংসতা। ইতিহাসের পাতায় নারায়ণগঞ্জে ১০৯টি গণহত্যা এবং ৩৩টির অধিক বধ্যভূমির তথ্য পাওয়া যায়, যা আজও পাকিস্তানি বর্বরতার সাক্ষ্য দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ পর্ব / আবদুল মান্নান। বাংলাপিডিয়া, খণ্ড ৮, ইন্টারনেটে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সাক্ষাৎকার।

















